নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধিঃ নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার সস্তাপুর এলাকায় পরিবেশ দূষণ এখন জনজীবনের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এলাকায় থাকা কয়েকটি শিল্পকারখানা ও ডাইং কারখানা থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া, দুর্গন্ধ ও দূষিত বর্জ্যের কারণে শিশু, বয়স্ক, নারীসহ সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন বলে দাবি তাদের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনের পর দিন কিছু কারখানা পরিবেশগত নিয়মনীতি উপেক্ষা করে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। কারখানার চিমনি থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া আশপাশের জনবসতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে গাছ কাটা ও গাছ পুড়িয়ে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। এতে একদিকে বায়ুদূষণ বাড়ছে, অন্যদিকে এলাকার স্বাভাবিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে পড়ছে।
দূষণের ভার বইছে সাধারণ মানুষ
ভুক্তভোগী এলাকাবাসীর ভাষ্য, কারখানাগুলোর ধোঁয়া ও দূষণের কারণে শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে সর্দি-কাশি, শ্বাসকষ্ট, অ্যালার্জি ও অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা বেড়েছে। দীর্ঘমেয়াদি বায়ুদূষণের কারণে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলেও তারা আশঙ্কা করছেন।
স্থানীয়দের প্রশ্ন—শিল্পকারখানা পরিচালনার কারণে যদি এলাকার মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্যের ওপর এমন বিরূপ প্রভাব পড়ে, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিয়মিতভাবে পরিবেশগত মান পরীক্ষা ও আইন প্রয়োগ করছে কি না?
প্রশাসনিক স্থাপনার এত কাছে দূষণ, তবুও নজরদারি কোথায়?
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অভিযোগ ওঠা এলাকাটি প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর খুব কাছেই অবস্থিত। এলাকাবাসীর দাবি অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট কারখানাগুলোর একটি সদর উপজেলা পরিষদ ও সদর উপজেলা প্রশাসনিক ভবনের কাছাকাছি এবং জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, জেলা পরিষদ, আদালতসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরেরও অদূরে।
প্রশ্ন উঠেছে—যদি প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কার্যালয়ের আশপাশেই দিনের পর দিন পরিবেশ দূষণের অভিযোগ থাকে, তাহলে জনবসতিপূর্ণ এলাকার সাধারণ মানুষকে নিরাপদ পরিবেশ দিতে কার্যকর নজরদারি কোথায়?
অভিযোগ করেও প্রতিকার মিলছে না—দাবি এলাকাবাসীর
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, পরিবেশ দূষণের বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন সময় সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে অভিযোগ জানানো হয়েছে। অভিযোগের পর পরিদর্শন হলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি বলে তাদের দাবি।
এলাকাবাসীর আরও অভিযোগ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিদর্শনকারী কর্মকর্তারা কারখানা মালিকপক্ষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে চলে যান। কেউ কেউ অনৈতিক লেনদেনের অভিযোগও তুলেছেন। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি।
‘চাঁদাবাজি’ নিয়ে গুরুতর অভিযোগ
পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি এলাকায় কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে কারখানা মালিকদের কাছ থেকে কথিত চাঁদা আদায়ের অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, কোনো কোনো ব্যক্তি বিভিন্ন প্রভাব খাটিয়ে কারখানা মালিকদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করছেন এবং এর ফলে সাধারণ মানুষের পরিবেশগত দুর্ভোগ আরও দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
তবে কারা এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, তারা কীভাবে অর্থ আদায় করছেন এবং কারখানা মালিকদের সঙ্গে তাদের কোনো ধরনের যোগসাজশ রয়েছে কি না—এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত প্রয়োজন।
অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
প্রশাসনের প্রতি কঠোর আহ্বান
সস্তাপুরের মানুষ কোনো বিশেষ সুবিধা চান না; তারা চান নিরাপদ বাতাস, সুস্থ পরিবেশ এবং আইনের সমান প্রয়োগ।
এলাকাবাসীর দাবি—
১. সস্তাপুরের সকল ডাইং ও শিল্পকারখানার পরিবেশগত অনুমোদন ও ছাড়পত্র যাচাই করতে হবে।
২. কারখানার চিমনি ও বায়ু নির্গমনের মান বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষা করতে হবে।
৩. কালো ধোঁয়া ও বিষাক্ত গ্যাস নির্গমনের প্রমাণ পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
৪. গাছ কাটা, গাছ পুড়িয়ে জ্বালানি ব্যবহার এবং পরিবেশবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্ত করতে হবে।
৫. শিল্পকারখানার তরল ও কঠিন বর্জ্য কোথায় এবং কীভাবে ফেলা হচ্ছে, তা সরেজমিনে তদন্ত করতে হবে।
৬. পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শন ও অভিযানের কার্যক্রম স্বচ্ছ করতে হবে এবং প্রয়োজনে তদন্ত প্রতিবেদন জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে।
৭. কোনো কর্মকর্তা, কর্মচারী, দালাল, প্রভাবশালী ব্যক্তি বা অন্য কারও বিরুদ্ধে অবৈধ লেনদেনের অভিযোগ থাকলে নিরপেক্ষ তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।
৮. কথিত চাঁদাবাজির অভিযোগ তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
৯. এলাকাবাসীর অভিযোগ গ্রহণের জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি কার্যকর অভিযোগ ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
১০. পরিবেশ দূষণের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিরূপণে স্বাস্থ্য বিভাগ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের সমন্বয়ে বিশেষ মেডিকেল ও পরিবেশগত জরিপ পরিচালনা করা উচিত।
মানুষের জীবন নিয়ে কোনো আপস নয়
একটি শিল্পকারখানা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অংশ হতে পারে, কিন্তু কোনো শিল্পের লাভের জন্য একটি জনপদের মানুষকে দূষিত বাতাসে শ্বাস নিতে বাধ্য করা যায় না।
উন্নয়নের নামে যদি শিশু, বৃদ্ধ, নারী ও সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে, তাহলে সেই উন্নয়ন টেকসই উন্নয়ন নয়। পরিবেশ আইন সবার জন্য সমান—কারখানা মালিক, প্রভাবশালী ব্যক্তি কিংবা সাধারণ নাগরিক—কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন।
সস্তাপুরের মানুষ তাই প্রশাসনের কাছে প্রশ্ন নয়, এবার কার্যকর পদক্ষেপ দেখতে চান।
দূষণ বন্ধে যদি আইন প্রয়োগ না হয়, অভিযোগ তদন্ত না হয় এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এই জনপদের পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ক্ষতির দায় কে নেবে?
সস্তাপুরবাসীর দাবি একটাই—দূষণমুক্ত পরিবেশ চাই, চাঁদাবাজিমুক্ত সমাজ চাই এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ চাই।
জনস্বার্থে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জরুরি হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।