নদী রক্ষায় কাজ হচ্ছে, কিন্তু অ্যাকশন কম: মেয়র আইভী

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী বলেন, ‘২১ বছর ধরে শুনছি শীতলক্ষ্যা, বুড়িগঙ্গা, তুরাগ নদীকে বাঁচাতে হবে। নদী রক্ষায় কাজ হচ্ছে, কিন্তু অ্যাকশন কম। নারায়ণগঞ্জ, সাভার, গাজীপুর, নরসিংদী, মুন্সিগঞ্জ এলাকাগুলো দূষিত হয়ে যাচ্ছে। ঢাকার আশপাশের অঞ্চল না বাচালে ঢাকা বাঁচবে না। এটা আমরা সবাই জানি ও বুঝি। কিন্তু কেউ অ্যাকশনে যাচ্ছে না। জরিমানা বা অভিযানের কথা বললেই বারবার বলা হয় লোকবল নেই, এই করতে হবে, তালিকা নেই, সংস্থার ক্ষমতা নেই নানান কথাবার্তা। আমাদের এখন কার্যকরী ভূমিকা রাখা ব্যতীত ভিন্ন কোনো পথ খোলা নেই।’

আজ মঙ্গলবার নারায়ণগঞ্জে ‘নদীতে শিল্প দূষণ রোধে করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভা ও গণশুনানি এ কথা বলেন মেয়র। বেলা ১১টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত শহরের আলী আহাম্মদ চুনকা নগর পাঠাগার ও মিলনায়তনের এক্সপেরিমেন্টাল হলে এই আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

বেলা ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের যৌথ উদ্যোগে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় অন্যান্যদের ভেতর বক্তব্য রাখেন নাসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জাকির হোসেন, নদী রক্ষা কমিশনের সহকারী প্রধান (পরিবেশ) সাকিব মাহমুদ, পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ফেরদৌস আনোয়ার, এলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা প্রমুখ।

সভায় সিটি মেয়র বলেন, ‘বেলা দীর্ঘদিন যাবৎ পরিবেশ ও মানুষের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। ২০০৯ সালে নারায়ণগঞ্জের চিত্তরঞ্জন পুকুর রক্ষা করার জন্য বেলার শরণাপন্ন হয়েছিলাম। তাদের মাধ্যমে রায় পেয়ে সেই পুকুরটি রক্ষা করতে পেরেছি। হাইকোর্টের রায় আছে নদীর তীরবর্তী জায়গা স্থানীয় সিটি করপোরেশন বা পৌরসভাকে দিতে হবে। সেখানে সবুজায়ন, খেলার মাঠ করতে হবে। আমরা নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছিলাম জায়গার জন্য। মন্ত্রণালয় বিআইডব্লিউটিএকে নির্দেশনা দিলেও সেই জায়গা আমাদের দেওয়া হয়নি। বাধ্য হয়ে সেই জায়গা দখল করেছি আমরা। অবশ্য আমি এখন দখলদার হয়ে গেছি। আমি রেলওয়ের জায়গা দখল করে শেখ রাসেল পার্ক করেছি, বিআইডব্লিউটিএর জায়গা দখল করে খেলার মাঠ ও গাছ লাগিয়ে দিয়েছি। এগুলো তো প্রয়োজন ছিল না যদি তারা আন্তরিক হতো।’

নদী দূষণে সিটি করপোরেশনের দায় স্বীকার করে মেয়র আইভী বলেন, ‘নদী দূষণে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন কিছুটা দায়ী। কারণ আমাদের যত বর্জ্য আছে তা নালার মাধ্যমে নদীতে ফেলা হয়। আমাদের একা নয় শুধু, সারা বাংলাদেশের সব সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এভাবেই বর্জ্য ফেলছে। আমরাই সবার আগে প্রস্তাব দিয়েছি ইটিপির মাধ্যমে পানি নদীতে ফেলতে চাই। ড্রেনের মাধ্যমে আসা সব পানি পরিশোধন করে নদীতে ফেলতে চাই। কিন্তু এর জন্য অর্থ দরকার, সেই ফান্ড কেউ দিচ্ছে না আমাদের।’

ক্ষমতাধরদের হাতে নদী দখল হয়ে আছে দাবি করে মেয়র আইভী বলেন, ‘নদীর পাড় তারাই দখল যাদের ক্ষমতা আছে। আমি একা কত প্রতিবাদ করব? আপনারাও একটু প্রতিবাদী হন। আমি আছি আপনাদের সঙ্গে। মাঝখানে নদী তীরে থাকা সব ডকইয়ার্ডের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান চলল। এখন আবার এসব অভিযান থেমে আছে। কেন থেমে আছে আমার জানা নেই। সেই আগের মতো আবারও নদী দখল শুরু হয়েছে। আমরা নদীর তীর ঘেঁষে ওয়াকওয়ে নির্মাণ করব বলে ১৪টি প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দিয়েছি। তাদের বলেছি আমি আপনাদের প্রতিষ্ঠান ভাঙব না, আপনারা আমাকে ডিজাইন দেন। কিন্তু তারা প্রথমে সম্মতি দিলেও এখন পর্যন্ত আমাকে কেউ ডিজাইন দেয়নি। এখন সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি ফান্ড পেলে এগুলো ভেঙে আমার ডিজাইন বাস্তবায়ন করব।’

নদীকে বাঁচাতে সরাসরি জরিমানা ও আইন প্রয়োগ প্রয়োজন দাবি করে আইভী বলেন, ‘প্রতিটা সংস্থা এখন ডেভেলপমেন্টের কাজ করতে চাচ্ছে। জানি না এখানে কি মধু আছে। দেশে এত সংস্থার প্রয়োজন নেই বলে আমি মনে করি। সরকার নির্দেশ দেবেন স্থানীয় সরকারকে। স্থানীয় সরকার তার লোকবল নিয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে ও সমন্বয় করে কাজ করবে। দেশের সকল মেয়র সমন্বয়হীনতার কথা বারবার বলে আসছি। আমরা যারা মেয়র নির্বাচিত হয়ে এসেছি তাদের আসলে ক্ষমতা খুবই সামান্য। চাইলেও অনেক কিছু করতে পারি না।’

বেলার প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘কারখানার দূষণের বিষয়গুলো সরকার অবগত রয়েছে। কিন্তু কোনো প্রক্রিয়ায় এই দূষণ রোধ করা সম্ভব এবং কীভাবে তা করতে হবে সেই বিষয়ে আমাদের সরকারকে সহযোগিতা করার পাশাপাশি ভূমিকা রাখতে হবে। আমরা আগামী নভেম্বরে পরিবেশ ও নৌ মন্ত্রীকে নারায়ণগঞ্জ এনে এই দূষণের বিষয়গুলো তাদের সামনে তুলে ধরতে চাই। লোকবলের অভাব এটা কোনো উল্লেখ করার মতো যুক্তি নয়, দেশের মানুষকে কাজে লাগাতে পারলে লোকবলের অভাব হবে না।

তিনি বলেন, ‘যেসব প্রতিষ্ঠান দূষণ করছে কীভাবে তাদের দূষণ না করে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় আসতে বাধ্য করা যায় সেই কাজটিই পরিবেশ অধিদপ্তর ও কলকারখানা অধিদপ্তরের দায়িত্ব। ছোট ছোট কারখানাগুলোকে একটি নির্ধারিত স্থানে এনে তাদের জন্য সম্মিলিত ইটিপির ব্যবস্থা করা যেতে পারে। হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি শিল্প যেমন স্থানান্তর হয়েছে, তেমনি এদেরও স্থানান্তর করা জরুরি। ব্যবসায়ীর কারখানার জন্য তো আমাদের নদী কিংবা বাতাস নষ্ট হতে দেব না। তাদের লাভের টাকা তো আমাদের দেওয়া হয় না। তাহলে তাদের লোকসান কেন পুরো সমাজ বহন করবে?’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *